বিষণ্ণতায় আক্রান্ত
বিষণ্নতা মানসিক সাস্থ্য

বিষণ্ণতায় আক্রান্ত হলে আপনাকে যা জানতে হবে

বিষণ্ণতা খুব সাধারণ। আমেরিকার প্রায় ১.৬ কোটি অধিবাসী এর সাথে লড়াই করে আসছেন প্রতি বছর। তবে যারা এই রোগে আক্রান্ত, নিজেদের অনুভূতিগুলো ব্যক্ত করা তাদের পক্ষে আসলেই কঠিন।

বিভিন্ন মানুষ বিভিন্নভাবে বিষণ্ণতায় আক্রান্ত হতে পারে। “আপনি যেমনটা শুনেন, বা টিভিতে দেখেন, সবসময় ব্যাপারটা সেরকম হয় না,” বলছিলেন ক্রিস্টাল ক্ল্যান্সি। তিনি মিনেসোটার বার্নসভিলের একজন লাইসেন্সড ম্যারেজ অ্যান্ড ফ্যামিলি থেরাপিস্ট। ২০০৫ সালে দ্বিতীয় সন্তানের জন্ম দেন তিনি, আর তার পর থেকে পোস্টপার্টাম ডিপ্রেসন (Postpartum Depression, সংক্ষেপে PPD)- তে ভুগছিলেন। এখন অবশ্য তিনি PPD ও অন্যান্য ধরণের বিষণ্ণতায় আক্রান্ত রোগীদের কাউন্সেলিং দিয়ে থাকেন।

বিষণ্ণতায় আক্রান্ত মানুষেরা যা অনুভব করে, তা শেয়ার করতে না-ও চাইতে পারে। কিন্তু বিষণ্ণতার ব্যাপারে জানলে আপনি এতে আক্রান্ত কাউকে সাহায্য করতে পারেন।

 

৭টি বিষয় রয়েছে, যেগুলো বিষণ্ণতায় আক্রান্ত মানুষ আপনাকে জানাতে চায়ঃ

১। বিষণ্ণতা আর মন খারাপ থাকা এক জিনিস নয়।

“মন খারাপ আমাদের সবারই কোনো না কোনো সময়ে হয়েছে। কিন্তু মন খারাপ থাকা ক্ষণস্থায়ী ব্যাপার। বিষণ্ণতা দীর্ঘস্থায়ী।”, বলছিলেন টিনা ওয়ালচ। নিউ ইয়র্কের অ্যামিটিভিলের সাউথ ওকস হাসপাতালের চিফ মেডিকেল অফিসার এবং একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ তিনি।

 

এমনকি হতেও পারে, আপনার মন খারাপ নেই কিন্তু আপনি বিষণ্ণ। যেমনটা বলছিলেন মার্ক ব্ল্যাক, কানাডার নিউ ব্রান্সউইকের ৩৮ বছর বয়স্ক একজন বক্তা এবং লাইফ স্ট্র্যাটেজি কোচ। তিনি বলছিলেন, “যখন আমার বিষণ্ণতা বেড়ে যায়, সব সময়ে কিন্তু মনটা খারাপ থাকে না। মাঝে মাঝে অন্যমনস্ক হয়ে পড়ি, বা আগ্রহ হারিয়ে ফেলি। আর অন্যান্য সময়ে, রাগ লাগে, হতাশা আসে।”

 

তিনি আরো বলছিলেন, “কাজের সময়ে ব্যাপারটা একটু ঝামেলাকর হয়ে যায়। কেননা কাজের সময়ে প্রচুর ডিমান্ড থাকে, আর সেই সাথে এটাও আশা থাকে যে, আমি হাসিখুশি থাকবো।”

 

ওয়ালচ বলছিলেন, “বিষণ্ণতার কারণে আপনার মনোযোগ ব্যাহত হতে পারে। আপনার রাগ লাগতে পারে, খিটখিটে লাগতে পারে। নিজের ব্যাপারে কেয়ার করার বা অন্যদের সাথে সময় কাটানোর ইচ্ছা হারিয়ে যেতে পারে।” তিনি আরেকটু বাড়িয়ে বলেন, “ব্যাপারটা এরকম, জীবনটা উপভোগ বা কাজে ব্যস্ত হওয়ার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলছেন আপনি।”

 

২। আশা করলেই বিষণ্ণতা ফুরোয় না

এবার কথা বলছিলেন অ্যাশলি ভ্যালেন্সিয়া, বয়স ৩০, ডালাসের প্রিন্টিং কাজের একজন পেশাদার। “লোকে ভাবে, বিষণ্ণতা আপনি নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন,” যেমনটা বলছিলেন তিনি, “কিন্তু বিষণ্ণতাগ্রস্ত কাউকে ‘প্রার্থনা করো’, ‘বিষণ্ণতা কাটানোর চেষ্টা করো’, অথবা ‘এটা করো, ওটা করো’- জাতীয় কথা বললে খুব একটা লাভ দেয় না আসলে।”

 

তাহলে কোন ব্যাপারটা কাজে দেয়? “সৌহার্দ থাকলে, স্নেহশীল হলে আর সহানূভূতি থাকলে,” ভ্যালেন্সিয়া বলছিলেন, “চেষ্টা করার বদলে ডাক্তারের সাথে কথা বলে আসল সমাধানটা বের করতে চাই।”

 

৩। বিষণ্ণতা প্রকৃত অর্থেই একটা রোগ

উইলিয়াম সিভেয় এর বয়স ৬৯ বছর, থাকেন কানাডার ক্যাম্ব্রিয়াতে। তিনি জানাচ্ছিলেন, “যখন বিষণ্ণতা ছিলো আমার, মাথায় দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা হতো।”

 

ওয়ালচ বলছিলেন, “অনেকে এখনো মনে করেন বিষণ্ণতা প্রকৃত অর্থে চিকিৎসাশাস্ত্রীয় কোনো রোগ নয়। কিন্তু গবেষণায় দেখা গিয়েছে, এটা আসলেই একটা রোগ।”

 

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বিষণ্ণতা বিভিন্ন জিনিসের সংমিশ্রণে ঘটে। ওয়ালচ পরামর্শ দেন, “যদি বিষণ্ণতার লক্ষণ দেখা দেয় আপনার মাঝে, মেডিকেল বা হেলথ প্রফেশনালের সাথে আপনার দেখা করা দরকার।”

 

৪। শক্তপোক্ত থাকলেও বিষণ্ণতা কাজ করতে পারে

বিষণ্ণতার কারণে শক্তি প্রায় নিঃশেষ হয়ে যেতে পারে, যা আপনার অবস্থার মারাত্মক অবনতি ঘটিয়ে ফেলতে পারে। তবে বিষণ্ণতায় আক্রান্ত অনেককেই দেখতে মনে হয় না তারা বেশ লড়াইয়ের ভিতর আছেন।

 

“আপনি খুব শক্ত-সমর্থ মানুষ, আপনার ‘বিষণ্ণতা’ দেখা যায়, বা বিষণ্ণ মানুষদের মতো আপনার আচরণ নয়; এসবের মানে এই নয় যে আপনি বিষণ্ণতায় আক্রান্ত নন।” এমনটা বলছিলেন হলি রড্রিগ্‌জ, মধ্য আটলান্টিক এলাকার একজন প্রফেশনাল।

 

তিনি যোগ করেন, “ ‘স্ট্রং ব্ল্যাক উইম্যান’ টাইপের যে প্রচলিত ভুল ধারণাটা রয়েছে (স্ট্রং ব্ল্যাক উইম্যান বলতে বোঝায়, কালো মহিলারা শক্তিশালী হয়), আমার মতো আফ্রিকান-আমেরিকান মহিলাদের জন্য এটা বেশ ক্ষতিকর। কেননা এ ধারণার বশবর্তী হয়ে আমাদের অনেকেই এই রোগের ব্যাপারে কিছুই জানতে পারে না, এবং তাই নিজে নিজে ব্যাপারটা ঠিক করার চেষ্টা করে।”

 

৫। বিষণ্ণতার কাটানোর ওষুধ আপনাকে মুটিয়ে ফেলে না

“কথাটা সবসময়ে শুনে থাকি।” বলছিলেন ভ্যালেন্সিয়া। তবে বিষণ্ণতা কাটানোর ওষুধ সেবনের মাধ্যমে তিনি ভালো বোধ করতে পেরেছেন। তিনি বলেন, “এখনো বিষণ্ণতা কাজ করে ঠিকই, তবে ব্যাপারটা এখন আরো সহজ লাগে আমার কাছে।”

 

বিষণ্ণতায় আক্রান্ত সবাইকেই যে ওষুধ সেবন করতে হবে, বিষয়টা এমন নয়। কিন্তু যারা সেবন করেন, তাদের জন্য বেশ কিছু ভালো সুযোগ আছে যেগুলোর মাধ্যমে তাদের ভালো লাগবে। (টক থেরাপি, লাইফস্টাইল পরিবর্তন, এবং ব্রেইন স্টিমুলেশন থেরাপিও বিষণ্ণতা কাটাতে বেশ সহায়ক।)

 

৬। বিষণ্ণ হওয়া অকৃতজ্ঞতার চিহ্ন নয়

বিশেষ করে পোস্টপার্টাম ডিপ্রেসনে আক্রান্ত নতুন পিতামাতাদের শোনা লাগে, “বুঝতে পারছি নতুন একটা বাচ্চা হবার পর কেন তুমি এত বিষণ্ণ থাকো,” অথবা “তোমার কৃতজ্ঞ থাকা উচিত, যখন অনেকে প্রাণান্তকর চেষ্টা করে যাচ্ছে কেবল বাচ্চা নেয়ার জন্য।”

 

ক্ল্যান্সি বলছিলেন, “বিষণ্ণতা একটা রোগ; নিজের ইচ্ছায় এটা আসে না। কতো কিছু আছে আপনার সেসবের হিসাব করলেই বিষণ্ণতা দূর হয়ে যাবে না।” তিনি আরো বলছিলেন, “আদতে যদি বিষণ্ণতায় আক্রান্ত কাউকে আপনি বলেন, যা আছে তাই নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে, কথাটা তাদের বিষণ্ণতাকে আরো বাড়িয়ে দিতে পারে।”

 

৮। ভালো লাগা মানেই বিষণ্ণতার সমাপ্তি নয়

কারো কারো জন্য বিষণ্ণতা ক্ষণস্থায়ী। কিন্তু অনেকের জন্যই এটা দীর্ঘস্থায়ী একটা রোগবিশেষ। হয়তো আপনি কয়েক মাস বা কয়েক বছর ভালো থাকতে পারেন, এরপর আবার আপনি বিষণ্ণতায় জরাগ্রস্ত হয়ে পড়তে পারেন।

 

“এটা একটা দীর্ঘস্থায়ী অবস্থা, ডায়াবেটিসের মতো,” ওয়ালচ বলছিলেন, “আপনার ব্লাড সুগার ভালো পরিমাণে আছে মানে এই না যে আপনি ইনসুলিন নেয়া বন্ধ করে দিবেন। একইভাবে, আপনার মুড ভালো, তাই বলে হঠাৎ করেই ওষুধ সেবন বা ডাক্তার দেখানো বন্ধ করে দিবেন না।” বরং, বিষণ্ণতাকে নিয়ন্ত্রণে রাখা মানে আপনার মেন্টাল হেল্প টিমের সাথে কাজ করা এবং নিজের দিকে খেয়াল রাখা, যদিও “দিনকাল ভালোই কাটে”।

  •  
    25
    Shares
  • 25
  •  
  •  
  •  
  •  
ডাঃ দানিয়াল ইবনে হাসান
ডাঃ দানিয়াল ইবনে হাসান বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল থেকে এমবিবিএস সম্পন্ন করে বর্তমানে ইন্টার্নিরত রয়েছেন।তিনি চিকিৎসা সম্পর্কিত নানা প্রকার লেখালেখী করেন। এছাড়াও বিভিন্ন প্রকার সামাজিক ও সেবামূলক কর্মকান্ডের সাথে জড়িত আছেন।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।