অন্যান্য সুস্থ্ বার্ধক্য

হিয়ারিং এইড বা কানে শোনার যন্ত্র ব্যবহার

জনাব সাইফুল ইসলাম বয়স ৬০ বছর, হঠাৎ তার শ্রবণশক্তি লোপ পাওয়ার কারনে আমাদের কাছে আসেন। আমরা পরীক্ষা-নিরীক্ষ করে দেখি তিনি ভাইরাসজনিত কারণে দুই কানে শতকরা ৬০ ডেসিবল শ্রবণশক্তি হারিয়েছেন। তাকে আমরা কানে হিয়ারিং এইড ব্যবহারে পরামর্শ দেই। তিনি হিয়ারিং এইড ব্যবহারর করে স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারেন এবং দৈনন্দিন কাজকর্ম করতে পারেন। হিয়ারিং এইড ব্যবহারে লজ্জার কিছু নেই। আমরা চোখে যেমন চশমা ব্যবহার করি, সেরকম কানে কম শোনার চিকিৎসা হলো হিয়ারিং এইড ব্যবহার করা।

 

শ্রবণশক্তি হারানো :
আমাদের সামাজিক পারিপার্শ্বিক ও যোগাযোগের ক্ষেত্রে শ্রবণশক্তিঅনেক গুরুত্বপুর্ণ ভূমিকা রাখে। প্রতিদিন ঘরে-বাইরে আমাদের অনেক মানুষের সম্মুখীন হতে হয়, এর মধ্যে কম মানুষ শ্রবণ সুরক্ষাকারী যন্ত্র পরে অথবা শ্রবণ বিশেষজ্ঞের কাছে যায়। শ্রবণশক্তি হারানো যে কোনো বয়সেই হতে পারে। বয়স বাড়লে আমাদের শরীরবৃত্তীয় অনেক কিছু পরিবর্তন হয়, তার মধ্যে শ্রবণশক্তি অন্যতম। শ্রবণশক্তি হারানো মানে শুধু উচ্চ শব্দ শুনতে না পারা নয়। এর অর্থ হলো কোনো কিছু বোঝা এবং বিভিন্ন কথার শব্দকে পার্থক্য করতে না পারা। যদি শ্রবণশক্তি হারানো চিকিৎসা না করা হয় অথবা দেরি হয় তাহলে শিশুদের কোনা কিচু জানার ক্ষমতা , ভাষা দক্ষতা এবং বিকাশ করার ক্ষমতা কমে যায়। শ্রবণশক্তি হারানো মানুষকে বিচ্ছিন্ন, দুর্বল, একাকিত্ব করে দিতে পারে। কানে শোনার ক্ষমতা কমে যাওয়ার কারণে ভাব প্রকাশ করার ক্ষমতা কমে যেতে থাকে এবং সাথে বু্িদ্ধ ও মানসিক ত্রুটি দেখা যায়, যার জন্য শিশুদের স্কুলে অথবা যেকোনো বয়সের মানুষের কর্মস্থল ও সামাজিক কার্যকলাপে সমস্যার সম্মুখীন হতে হয। শ্রবণশক্তি হারানো মানুষের জীবনে অনেক প্রভাব বিস্তার করে।

 

শ্রবণশক্তি হারানোর গুরুত্বপূর্ণ কারণগুলো হলো –

  • বয়োঃপ্রাপ্তি
  • ব্যাকটেরিয়া অথবা ভাইরাস সংক্রমণ
  • দীর্ঘদিন উচ্চ শব্দে থাকা
  • কানে ময়লা জমা হয়ে কান বন্ধ হয়ে যাওয়া
  • কানে ফাঙ্গাল ইনফেকশন

অন্যান্য কারণ –

  • জন্মগত ত্রুটি
  • কানে আঘাত
  • বংশগত কারণ
  • কানে ক্ষতিকর কিছু ওসুধ
  • কনে বা ব্রেনের টিউমার
  • অন্যান্য আরও কারণ

কখন উচ্চশব্দ আমাদের জন্য ক্ষতিকর?

কখন শব্দ উচ্চ শব্দ হিসেবে প্রতিপন্ন হয় তা নির্ভর করে একেক জনের শ্রবণশক্তির ওপর ভিত্তি করে । যখন শব্দ অস্বচ্ছন্দ হয় বা কানে বিরক্ত লাগে, তখনই আপনি এর প্রতিক্রিয়া করবেন। আপনার কানে শোনার ক্ষমতা বলে দেবে কখন শব্দ আপনর জন্য ক্ষতিকর। এটাই আমাদের মানবদেহের সতর্কীকরণ পদ্ধতি।

 

শব্দ শোনার ক্ষমতাকে প্রতিরক্ষা করার কিছু টিপস-
উচ্চ শব্দের উৎস থেকে নিজেকে দুরে রাখতে হবে।

 

কানে প্লাগ ব্যবহার করা –
যেখানে শব্দের সীমা অনেক বেশি যেমন কোনো গানের অনুষ্ঠান, কনসার্ট সেখানে কানের প্লাগ ব্যবহার করা উচিত।

কী ধরনের হিয়ারিং এইড পাওয়া যায়?

 

সাধারণ প্রকারগুলো হলো :

 

কানের পেছনে : এগুলো ব্যবহারকারীর কানের ােপছনে দেয়া হয় এবং ইয়ার মোল্পের সাথে প্লাষ্টিক দ্বারা সংযোগ করা হয়্ সম্পূর্ণ শ্রবণশক্তি হারানো লোকদের জন্য বিটিই ব্যবহার করা হয়।

 

কর্ণের ক্যানেলের ভেরতে (আইটিই) : এ ধরনের মডেলগুলো ইয়ার মোল্ডের ভেতর ইলেকট্রনিকক্যালি তৈরি একটা নির্দিষ্ট সাই দরকার ।

 

সম্পূর্ণভাবে কানের ভেতর (সিআইই) : এগুলোর সবচেয়ে ছোট ও সর্বশেষ হিয়ারিং এইড কানের ক্যানেলের ভেতর কানের পর্দার কাছে স্থাপন করা হয়। যেসব রোগী হিয়ারিং এইড দেখাতে চান না, তখন সিআইসি হিয়ারিং এইড কসমেটিক হিসেবেও ব্যবহৃত হয় । সিআইসি হিয়ারিং এইডের মূল্য খুব বেশি এবং এটা বাহির থেকে দেখা যায় না। এগুলো সাধারণ থেকে মাঝামাঝি শ্রবণশক্তি হারানোর জন্য ব্যবহার করা হয়।

 

বডি ওর্ন হিয়ারিং এইড : এই হিয়ারিং এইডগুলো মাইক্রোফোন এমপ্লিফায়ার একটা কর্ডবিশিষ্ট রিসিভার এবং ইয়ার মোল্ড এই হিয়ারিং এইডগুলো সম্পূর্ণ শ্রবণশক্তি হারানোর জন্য ব্যবহার করা হয় অথবা অন্যান্য হিয়ারিং এইড যদি কেউ ব্যবহা করতে না পারে তাহলে এই হিয়ারিং এই ব্যবহার করা হয়।

 

হিয়ারিং এইড বলতে কি বুঝায় ?

হিয়ারি এইডের সাধারন সংজ্ঞা হলো এখানে একটা মিনি মাইক্রোফোনসহ একটা লাউড স্পিকার থাকবে এবং একটা রিসিভার থাকবে। এটার কাজ হলো আমাদের কানে শব্দ এনটিনসিফাই এবং এমপ্লিফাই করা। মাইক্রোফোনের কাজ হলো শব্দতরঙ্গকে ইলেক্ট্রনিক সিগন্যালে পরিনত করা। এমপ্লিফিটারের কাজ হলো এই ইলেক্ট্রনিক সিগন্যালকে এমপ্লিফাই করা। এই এমপ্লিফাই ভলিভল কন্ট্রোল দিয়ে কন্ট্রোল করা যায়। রিসিভার এমপ্লিফাইড ইলেক্ট্রনিক সিগন্যালকে শব্দে রুপান্তরিত করে। ইয়ার মোল্ড কানের ভেতরে থাকে আর এটা এমন ভাবে ব্যবহারকারীর কানে প্রতিস্থাপন করা হয় যাতে শব্দ ঠিকমতো কানে পৌছে।

 

কখন হিয়ারিং এই দরকার ?

যদি কারো প্রতিদন সংযোগ রক্ষা করা অথবা সমস্যা হয় তখন হিয়ারিং এইড দরকার হয়। অনেক সময় ভুক্তভোগীরা বুঝতে পারে না তার শ্রবণ এইড দরকার । পরিবরের লোকেরা এবং সহকর্মীরা তার সথে সংযোগ রক্ষ করতে পারে না। যদি আপনি অথবা আপনর কাছের লোক মনে করে আপনার শ্রবণশক্তি কমে গেছে, তহারে আপনি একজন নাক-কান-গলা বিশেষজ্ঞ দিয়ে পরীক্ষা করে নেবেন।

 

কী ধরনের হিয়ারিং এইড দরকার ?

কী ধরনের শ্রবণশক্তি হারিয়েছে তার ওপর নির্ভর করে শ্রবণ এইড কিনতে হয়। সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো কী ধরনের যোগাযোগ রক্ষা করা রোগীর দরকার । একজনের একটা অথবা দুটো হিয়ারিং এইড ব্যবহার করা দারকার হতে পারে।

 

মস্তিস্কের সাথে দুই কানেরই যোগাযোগ :
অ্যাকাডেমিক লিটারেচারের সাপোর্ট করে দুই কানের এমপ্লিফিকেশন যখন আপনি দুই কানে হিয়ারিং এইড ব্যবহার করবেন। তখন আপনার কম পাওয়ার লাগবে। রোগী ভারো বুঝতে পারবেন বিশেষ করে উচ্চ শব্দের সময় । হিয়ারিং এইড ব্যবহার কারী ভালো পারসেপশন পাবেন্। আপনি  নিরাপদ থাকবেন কারণ আপনি বুঝতে পারবেন কোথা থেকে শব্দ আসছে। আপনি ভালো শব্দের গুণাগুণ পাবেন । চূড়ান্তভাবে বলতে হয় আপনার কতটা এবং কী টাইপের শ্রবণক্ষমসতা হারিয়েছে এবং কী ধরনের সংযোগ করা দরকার।

 

হিয়ারিং এইড কি সাধারণ শ্রবণশক্তি ফিরিয়ে দেয় ?

না হিয়ারিং এইড সাধারন শ্রবণশক্তি ফিরাতে পারে না এবং সব ধরনের শ্রবণ বিশেষ করে শব্দের ব্যাকগ্রাউন্ড এবং দূরের শব্দের ক্ষেত্রে হিয়ারিং এইড হলো একটা কমপেনসেশন।

 

হিয়ারিং এইড লাগানোর পরে ফলোআপ দরকার আছে কি না অথবা দরকার থাকলে কত দিন পর পর দরকার ?

হ্যাঁ, পলোআপের দরকার আছে । কারণ শ্রবণ পরিবর্তন হতে পারে এবং শ্রবণক্ষমতা কম-বেশি হতে পারে, এগুলো যত তাড়তাড়ি সম্ভব করতে হবে যাতে শ্রবণশক্তি হারানো প্রতিরোধ করা যায়। যখন আপনি হিয়ারিং এইড নেবেন আপনাকে একটা পূর্নমূল্যায়ন করতে হবে নিয়মিতভাবে। আপনার হিয়ারিং এই ও পরীক্ষা করতে হবে। আপনার এই চেকআপ প্রতি বছর করতে হবে আপনার শ্রবণ বিশেষজ্ঞ অথবা ডাক্তারের পরামর্শ অনুসারে।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
ডাঃ দানিয়াল ইবনে হাসান
ডাঃ দানিয়াল ইবনে হাসান বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল থেকে এমবিবিএস সম্পন্ন করে বর্তমানে ইন্টার্নিরত রয়েছেন।তিনি চিকিৎসা সম্পর্কিত নানা প্রকার লেখালেখী করেন। এছাড়াও বিভিন্ন প্রকার সামাজিক ও সেবামূলক কর্মকান্ডের সাথে জড়িত আছেন।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।