ফিটনেস ও ব্যায়াম বাত সমস্যা স্বাস্থ্য পরামর্শ

নীরোগ ঘাড় ব্যথামুক্ত জীবন

আমরা সারা জীবনে নানান রকম ব্যথায় ভুগে থাকি। আর সেই ব্যথা যদি হয় ঘাড়ের তাহলেই নানা প্রকার বিপত্তি দাড়ায়, যেমন- ঘুমাতে ব্যথা হয়, বসে বসে কাজ করতে ব্যথা হয , ভ্রমণ করতে ব্যথা হয় ইত্যাদি। ঠিক এমনই একজন রোগী আব্দুল মোতালেব, বয়স,৫২ বছর। তিনি কাজ করেন এ্যাকাউন্ট্যান্ট হিসেবে। আমার সামনে এসে বসলেন এবং বলতে থাকলেন তার রোগের বিভিন্ন কষ্টের কথা গলায় পড়েছিল সার্ভাইক্যাল কলার। যা নাকি তার জন্য সঠিক মাপের নয়। বলে রাখা ভালো সার্ভাইক্যাল কলার ব্যবহার করতে হলে তিনটি জায়গায় মাপ দিয়ে সার্ভাইক্যাল কলার কিনতে হবে অথবা তৈরি করতে হবে। তিনি ঘাড়ের ব্যথার ভুগছেন ১৮ মাস ধরে । ঘাড় থেকে ব্যথা বাম স্ক্যাপুলাতে আসে আসে, বাম হাতের আঙুলগুলো ঝিঁঝিঁ করে। এ ছাড়াও বাম ট্রাইসেফ মাসেল ফোর আর্ম এবং কব্জিতে ব্যথা হয়। মাথা বাম দিকে ঘুড়ালে এবং পেছনে দিকে নিলে ঘাড়ে অনেক ব্যথা হয় এবং হাতে চলে আসে। ঘাড়ের বাম পাশে চাপ দিলে ব্যথা অনুভব হয় অর্থাৎ জায়গাগুলো বেশ টেন্ডার । আব্দুল মোতালেবকে পাশ থেকে দেখতে পেলাম তার চিন সামনের দিকে আছে, অর্থাৎ এন্টিরিওর হেড পোশ্চার, নেক ফোল্ড দেখা যাচ্ছে এবং রাউন্ডেড শোল্ডার। এমআরআইতে বলা হয়েছে, সি-৬-৭ লেভেল ডিস্ক হার্নিয়েশন ও ফেসেট-আনসিনেট হাইপার ট্রপি। এক্সরেতে দেখা যাচ্ছে, সি৬-৭ লেভেল-এর স্পেস কমে গেছে এবং মাসেল ইমব্যালেন্স।

 
ঘাড় ব্যথার জন্য অনেক লোকই তার দৈনন্দিন জীবনের কাজ সঠিকভাবে করতে পারছে না এবং আর্থিক ক্ষতি সাধনও হচ্ছে। বিভিন্ন গবেষনায় বলা হয়েছে, ৬৭-৭১% লোক ঘাড় ব্যথায় ভুগে থাকেন। এই ঘাড় ব্যথায় বেশির ভাগ ভোগের মহিলা, উন্নত দেশের লোক এবং যারা শহরে বাস করেন বেশির ভাগ ঘাড়ের ব্যথা যেকোনো সময়ই হতে পারে এবং সেটা কম বয়সী ও বেশি বয়সওে হতে পারে। তবে ৩৫ কিংবা তা উর্ব্ধে বয়সী লোকেদেরও বেশি দেখা যায়।

 
এই ঘাড় ব্যথা মাস্কুলোস্কেলিটাল রোগের মধ্যে অন্যতম। এটি একটি গ্লোবাল বার্ডেন ডিজিজ। আমাদের দেশে যারা এই রোগে আক্রান্ত হয় তাদের মধ্যে টেবিলে বসে যারা কাজ করে বা পড়াশোনা করে, গৃহীনী, শিক্ষক, কম্পিউটার ওয়ার্কার, ফিমেল অফিস ওয়ার্কার এবং আরো অনেকেই।
যেসব রোগী ঘাড় ব্যথায় ভোগেন তাদের ট্রাপিজিয়াস মাসেল অধিকাংশ সময়ই বিরামহীনভাবে কাজ করে। ঘাড় ব্যথার কারণের জন্য অধিকাংশ সময় এই ট্রাপিজিয়াস মালেসের এ রকম কাজ দিনের পর দিন মাসেলের পরিবর্তন ঘটায় এবং এ কারণে মায়ালজিয়া হতেই পারে।
গবেষনায় দেকা গেছে, ট্রাপিজিয়াস মাসেলের কার্যকারিতা এবং ঘাড় ব্যথার মধ্যে সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যায়। সুপ্রিয় পাঠক মনে রাখবেন, বিভিন্ন কাজের জন্য ঘাড় ব্যথা হতে পারে যেমন-যারা বেশি কম্পিউটারে কাজ করে তাদেরও ঘাড় ব্যথা হতে পারে। পঞ্চাশ ভাগ ওয়ার্কারদের কাজের সাথে ঘাড়ের ব্যথার সম্পর্ক রয়েছে। যারা বিভিন্ন ধরনের কাজের সাথে যুক্ত আছেন তাদের ঘাড়ের ব্যথার প্রবণতা অনেক বেশি। যেমন ঃ অফিসে যারা কাজ করেন তাদের ঘাড়ের ব্যথা অন্যদের তুলনায় ৫০-৬০শতাংশ বেশি হয়।

 
বিভিন্ন কারনে ঘাড়ের ব্যথা হতে পারে। ঘাড় ব্যথার অন্যতম কারণগুলোর মধ্যে – সামনে ঝুঁকে অনেকক্ষণ কাজ কর, অসঠিক ভাঙ্গিতে টেলিভিশন দেখা ও লেখাপড়া কজরা এবং ঘুমানো । এছাড়াও রোড ট্রাফিক এ্যাক্সিডেন্ট, মাংসের দুর্বলতা, সার্ভাইক্যাল কার্ভেচারের পরিবর্তন, স্পন্টিলোসিস, স্প্রেইনস ও স্ট্রেইনস, টেনশন, টার্টকলিস, ডিস্ক প্রবলেম, প্যাজেট ডিজিজ, টিউমার, ইনফেকশন ইত্যাদি কারণে ব্যথা হতে পার্ েঘাড়ের চিকিৎসা করার আগে পরীক্ষা করে বের করতে হবে কী কারণে ব্যথা হয়েছে।

 
আব্দুল মোতালেব চিকিৎসা শুরুতেই ঘাড়ের সফট টিস্যু মুবালাইজেশন করতে হবে। নেক রিট্রকাশন করতে হবে, তারপর ডান দিকে ঘুড়াতে হবে ২০ ডিগ্রি, এরপর ডান দিকে কাত করতে হবে। মনে রাখতে হবে চিকিৎসা বা মুভমেন্ট যেন ওই জায়গায় পৌঁছে যে জায়গায় যে জায়গায় টিস্যুগুলো অবস্থিত।অর্থাৎ ইউর ট্রিটমেন্ট মাষ্ট রিচ টু দ্য লেশন। এভাবে বারবার করলে তার কষ্ট চলে যাবে। তারপর সঠিক মাসেল ষ্ট্যাবেলাইজিং এক্সারজাইজের মাধ্যমে শক্তিশালী এবং স্থিতিশীল করতে হবে। তার সাথে লো-লেভেল লেজার, আল্ট্রাসাউন্ড থেরাপি ব্যবাহর করতে হবে এবং ওয়াক্সপ্যাক দিয়ে তার ঘাড়ের স্ট্রোকিং করে দিতে হবে। এর পর অ্যাপ্লাইড কাইনিসিওলজি বেজড হতে এক্সারসাইজের মাধ্যমে নেক-এর অন্যান্য মাসেলের শক্তি বাড়াতে হবে। সামনে পেছনে এবং দুই পাশে মায়োফোসিয়াল রিলিজ করতে হবে। পরিশেষে মাসেল অ্যাক্টিভেশন এক্সারসাইজ করতে হবে। এই রোগীর জন্য উপদেশ বাসায় নিয়মিত আমাদের দেখানো সঠিক এক্সারসাইজ করবে ।যে কাজ করলে কষ্ট বেড়ে যায় ওই কাজ করবেন না। গরম সেক অথবা গরম পানি দিয়ে গোসল করতে হবে। ফার্মবেড-এ ঘুমাবে এবং যেভাবে ঘুমালে কষ্ট হবে না সেভাবে ঘাড়, মাথা রেখে ঘুমাবেন। ধূমপান বর্জন করুন।

 
ঘাড়ের ব্যথা প্রতিরোধ, চিকিৎসার চেয়ে অনেক উপকারী। যেমন – সার্ভাইক্যাল কলার ব্যবহার করার সময় সতর্কতা মেনে চলতে হবে। কারণ করাল ব্যবহার করলে অনেক সময়ই নেকের বা ঘাড়ের মবিলিটি কমে যায় এবং মাংস দুর্বল হয়, যা ঘাড়ের কষ্ট আরো বাড়িয়ে দেয়। সঠিকভাবে ঘুমানো এবং কম্পিউটাররে কাজ করার সময় যেন কম্পিউটার স্ক্রিন এবং আই লেভেল সঠিক থাকে। একই অবস্থায় বেশিক্ষণ কাজ না করা, কখনোই যেন মাথা ও চিন কাধ থেকে সামনে চলে না আসে । কাজের মাঝে ভঙ্গি পরিবর্তন করতে হবে। সঠিক ভঙ্গিতে ফোনে কথা বলা এবং কান ও কাধের মাঝে টেলিফোন ব্যবহার করা যাবে না, প্রচুর পরিমান পানি পান করতে হবে, হাতে ওজন ব্যবহার করার সময় সঠিক নিয়ম মেনে চলা। মাথা, ঘাড়, ও কাঁধের সঠিক ভঙ্গি মেনে চলা, ঘাড়ের মাংস ট্রিগার পয়েন্ট রিলিফ করা,, হুইপ্লাস প্রতিরোধ করা, প্রতিদিন ঘাড়ের মাংসের নিয়মিত স্ট্রেসিং ও স্ট্রেনদেনিং করা।

 
খাদ্য তালিকায় একটু পরিবর্তন আনতে হবে যেমন-প্রচুর পানি খেতে হবে, দিনে ২ গ্লাস দুধ-খাবারের ১ ঘন্টা আগে অথবা খাবারের ২ ঘন্টা পরে দুধ খাবেন। দুধের বিকল্প হিসেবে তিল ভর্তা খেতে পারেন। সাথে ২ চামচ আদার রস প্রতিদিন খেতে হব্ েসুপ্রিয় পাঠক, আপনারা যারা এই রোগে ভুগছেন তারা ওই চিকিৎসার মাধ্যমে আশ করি দ্রুত আরোগ্য লাভ করবেন।

 
আমরা বিভিন্ন গবেষণা গড়ে জানতে পেরেছি, এখনো এমন ওষুধ তৈরি হয়নি যে ওষুধ খেলে আপনার মাংস পেশি লম্বা হবে, শক্তিশালী হবে এবং আপনার জয়েন্ট মবিলিটি বেড়ে যাবে এবং আপনার এন্টিরিওর হেড পোশ্চার করেকশন হবে। মনে রাখবেন, ফিজিওথেরাপি ওই অসুবিধার চিকিৎসার জন্য একমাত্র মেডিসিন সুতরাং সম্পুর্ণ চিকিৎসা পেতে হলে আপনাকে সঠিক মোবালাইজেশন, মেনুপুলেশণ, স্ট্রেসিং এবং স্ট্রেনদেনিংয়ের মতো চিকিৎসা করতেই হবে।

 
ডা: সাইম আরাফাত হোসন

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
ডাঃ ফাহিম আবরার হোসেন
ডাঃ ফাহিম আবরার হোসেন বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল থেকে এমবিবিএস সম্পন্ন করে বর্তমানে ইন্টার্নিরত রয়েছেন। উনি বর্তমানে দেশের একটি অন্যতম মেডিকেল শিক্ষার্থীদের সংগঠন BMSS (Bangladesh Medical Students' Society) এর প্রেসিডেন্ট হিসাবে দায়িত্বরত আছেন। এছাড়াও বিভিন্ন প্রকার সামাজিক ও সেবামূলক কর্মকান্ডের সাথে জড়িত আছেন।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।