শিশুদের সুস্থভাবে গড়েতোলা শিশুর যত্ন

শিশুর জ্বর ও আপনার করনীয়

আমাদের দেহের স্বাভাবিক তাপমাত্রা ৯৮.৪০ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা ৩৭০ সেন্টিগ্রেড। তাপমাত্রা যখন এর চেয়ে বেশি হয়, তখন আমারা তাকে জ্বর বলি। জ্বর নিজে কোনো রোগ নয়, অন্য কোনো রোগের উপসর্গ মাত্র।উল্লেখ্য ভাইরাস কিংবা ব্যাক্টেরিয়াজনিত সংক্রমণ সাধারণত জ্বর হয়। জ্বর হলো একটা প্রতিরক্ষাব্যবস্থা যা শিশুকে সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সাহায্য করে। তবে জ্বর যে কারণেই হোক জ্বরের চিকিৎসা করা প্রয়োজন। জ্বরের চিকিৎসার সাথে সাথে আসল রোগ নির্ণয় করে তার সঠিক সিকিৎসা করতে হবে। পাশাপাশি শিশুর সঠিক যতœ নিতে হবে।

জ্বরের সাথে সাথে রোগের অন্যান্য উপসর্গ দেখা দিতে পারে। যেমন :

  • এ সময় শিশু একটু বেশি কান্না করতে পারে।
  • সর্দি, কাশি, পেট ব্যাথা, পাতলা পায়খানা হতে পারে।
  • খাওয়ার প্রতি রুচি করে যেতে পার্ ে
  • জোর করে খাওয়াতে গেলে বমি করতে পারে।
  • দেহের তাপমাত্রা বেশি বেড়ে গেলে শিশু জ্বরের ঘোরে অচেতন হয়ে পড়তে পারে, আজেবাজে বকতে পারে।
  • ঘুম নষ্ট হতে পারে, অনর্থক ঘুম থেকে জেগে চিৎকার করতে পারে
  • অনেক সময় শিশুর খিচুনিও হতে পারে।
  • শরীরে লাল দানাদর র‌্যাশ বা দাগ হতে পারে।

জ্বরের বিভিন্ন ধরন রয়েছে। কোনো কোনো জ্বর সারা দিন রাত একই রকমথাকে কখনো তাপমাত্রা স্বাভাবিক বা তার নিচে নামে না। কোনো কোনো জ্বর দিনে এক বা একাধিকবার আসে মাঝখানে শরীরের তাপমাত্রা স্বাভাবিক থাকে। অনেক জ্বর ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে এবং কয়েক দিনের ভেতর তা বেড়ে প্রায় ১০৩০-১০৪০ ফারেনহাইটের মতো হয়। কোনো কোনো জ্বর শুরু থেকেই অনেক বেশি হয়ে আসে। অনেক সশয় আবার জ্বর যেদিন হলো সেদিন কয়েক ঘন্টা পর কমে যায় এবং কযেক দিন পর আবার একই নিয়মে বাড়তে ও করতে থাকে। কিচু জ্বর ওঠার সময় শীত শীত অনুভূত হয় এমনকি কাঁপুনিও হতে পারে। আবার জ্বর ছেড়ে যাওয়ার সময় বেশ ঘাম দিয়ে ছেড়ে যায়। অনেক সময় ঘুসঘুসে অর্থাৎ কম মাত্রার জ্বর অনক দিন ধরে চলতে থাকে। কোনো প্রদাহজনিত জ্বর হলে শিশু কয়েক দিনের ভেতর বেশ দুর্বল হয়ে যেতে পারে। যে কারণেই জ্বর হোক না কেন তা বেশিক্ষণ স্থা হতে দেয়া ঠিক না। কারণ এতে শিশু অত্যান্ত দুর্বল হয়ে যেতে পারে। তাই যেকোনো ধরনের জ্বরই হোক না কেন, অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ খাওয়াবেন। নিজে নিজে ওষুধ খাওয়াতে গিযে আপনার শিশুর ক্ষতির কারণ হবেন না।

আপনার করণীয় :

সঠিকভাবে তাপমাত্রা পরিমাপ :
শরীরের তাপমাত্রা সারাদিন ওঠানামা করে। তাপ¤্রতা সাধারণভাবে শেষ বিকেলে বা সন্ধ্যার শুরুতে বেশি থাকে। আর সবচেয়ে কম থাকে সকালবেলা। বিভিন্ন অসুখে জ্বরের ওঠানামা বিভিন্ন রকম, তাই জ্বরের এই ওঠানামা রক্ষ করে সঠিক সময়ে তাপমাত্রা মাপা খুবই জরুরী। ব্যয়াম করলে এবং গরম খাবার বা পানীয় পান করলে তাপমাত্রার পরিবর্তন ঘটতে পারে। তাই শিশু গরম দুধ বা পানীয় পান করে থাকলে তার ৩০ মিনিট পর তাপমাত্রা পরিমাপ করবেন। ছোট শিশুদের তাপমাত্রা বগলের নিচে বা কুঁচকির মাঝে মাপুন । কখনোই ছোট শিশুদের মুখে থার্মোমিটার দেবেন না। কারণ তারা কামড় দিয়ে থার্মোমিটার ভেঙ্গ ফেলতে পারে যাতে করে মুখের ভেতর কেটে যেতে পারে। বড় শিশুদের মুখে জিহ্বার নিচে অথবা বগলের নিচে তাপমাত্রা মাপতে পারেন। কাচ পারদ থার্মোমিটার ব্যবহারের আগে ঝাঁকিয়ে পারদ স্তম্ভ নামিয়ে দিয়ে বগরের নিচে, কুঁচকির মাঝে অথবা মুখে তিন মিনিট ধরে রাখতে হবে। ডিজিটাল থার্মেমিটার দ্রুত ও সঠিকভাবে তাপমাত্রা মাপা যায় এবং কাচ পারদ থার্মেমিটারের চেয়ে নিরাপদ। যদি আপনার শিশুরতাপমাত্রা ১০০ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা তার বেশি হয় তাহরে বুঝবেন আপনার শিশুর জ্বর হয়েছে।

শিশুকে হালকা পোশাক পরান :

জ্বর হলেই ঠান্ডা লাগবে- এ ধারনাটা ঠিক নয়। তাই একগাদা কাপড় কাঁথা দিয়ে শিশুকে জড়িযে রাখা যাবে না। কারণ এতে জ্বর বাড়বে ছাড়া কমবে না। ছোট একটা উদাহরণ দিয়ে জিনিসটা বোঝা যাবে। রান্না করা খাবার গরম রাখার জন্য ঢেকে রাখা হয়।  যতক্ষণ ঢাকা থাকে, ততক্ষণ খাবার সহজে ঠান্ডা হয় না। তেমনি যতক্ষণ শিশুকে ঢেকে রাখা হবে, ততক্ষণ শিশুর জ্বর কমবেনা। জ্বর হলে শিশুর গায়ে হালকা কাপড় রাখুন। জ্বরবেশি হলে শিশুর সব জামা কাপড় খুলে দিন। জ্বর কমতে সহায়তার জন্য ঘরের জানালা-দরজা খোলা রাখুন। ফ্যান হালকা করে ছেড়ে রাখুন বা হাতপাখা দিয়ে শিশুর সমস্ত শরীরে বাতাস করুন। তবে শিশুর জ্বর কমে যাওয়ার সাথে সাথে হালকাপাতলা কাপড় দিয়ে ঢিকে দিন। শীত বোধ হলে চাদর বা কাঁথা গায়ে দিয়ে দিতে পারেন।

শিশুকে প্রচুর তরল খাওয়ান :

জ্বরের সময় সাধারণ শিশুরা খেতে চায় না। অনেকে শুধু পানি খেতে চায়, অনেকে আবার তাও খেতে চায় না। খাবার সমনে আনলে বলে এটা নয় ওটা খাব। অনেক সময় নতুন খাবারেও বায়না ধরে। কিন্তু তা দিলেও খেতে চায় না। এসবই অসুস্ত শিশুর জন্য স্বাভাবিক । তবে তাবে যে কোনে হোক পানি বা অন্য কোন তরল খাবার খাওয়াতেই হবে।

জ্বর ও খিচুনি :
জ্বরের সাথে খিচুনি অল্প বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে প্রায়ই দেখা যায়। এ ধরনের খিচুনি সাধারণত জ্বরের প্রথম দিনের হয়েথাকে। তবে জ্বর আসার পরের দিনও খিচুনি হতে পারে। শিশুদের জ্বর অত্যাধিক হলে মস্তিস্ক নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে ফলে শিশুর খিচুনি শুরু হয় এমনকি শিশু অজ্ঞান ও হয়ে পরে। এই খিচুনি বেশিক্ষণ স্থায়ী হলে মস্তিস্কের ক্ষতি সাধন হতে পারে। যা পরে শিশুর জন্য কিছু সমস্য হয়ে থাকে।

জ্বরের সাথে খিচুনি হলে কী করে বুঝবেন ?

  • শিশুর হাত পা ও ঘাড় শক্ত হয়ে যাবে।
  • শরীর ঝাকুনি দেব্
  • দাতে দাত লেগে যাবে
  • মুখ দিয়ে ফেনা বা লাল পড়তে পারে।

হাসপাতালে বা ডাক্তারের কাছে নেয়ার পথে নিম্নোক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন-

  • শিশুকে এক দিকে কাত করে শুইয়ে দেবেন, যাবে মুখের লালা গড়িয়ে বেরিয়ে যেতে পারে। এ অবস্থায় মাথার নিচে বালিশ দেবেন না এবং চিত করে শিশুকে শোয়াবেন না। কারণ এতে মুখের লালা বা থুথু শ্বাসনালীতে ঢুকে যেতে পারে । যার ফলে শিশুর শ্বাসকষ্ট হতে পারে।
  • শিশুর নাক, মুখ পরিস্কার করে দেবেন যেন কোন ধরনের থুথু বা লালা না থাকে ।
  • খিচুনির সময় শরীরে কোন আঘাত না লাগে খেয়াল রাখবেন।
  • জ্বর কমানোর জন্য তোয়ালে বা গামছা পানিতে ভিজিয়ে শিশুর দেহ হাত পা বারবার স্পঞ্জ করবেন।
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
নাজিয়া জামান
নাজিয়া জামান বর্তমানে ইবনে সিনা মেডিকেল কলেজে অধ্যায়নরত আছেন। উনি জনসচেতনতার জন্য অনলাইন ও বিভিন্নপ্রকার স্বাস্থ্য মেগাজিনে বিভিন্ন প্রকার আর্টিকেল লিখে থাকেন।

শিশুর জ্বর ও আপনার করনীয়” নিয়ে একজন ভাবছেন।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।